রবিবার , ডিসেম্বর ১৫ ২০১৯
শিরোনাম

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি

কুশিয়ারা নদী উপচে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের বিভিন্ন লোকালয়। নদীর পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছে মীরগঞ্জ বাজারের ওপর দিয়ে। ছবি: সংগৃহীত

‘আপনারা সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করলে আজ এ অবস্থা হতো না।’ সিলেটে এসে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের প্রতি এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার তিনি মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে সিলেটে এসে ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। মৌলভীবাজারে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বগুড়ায় নদ-নদীর পানি অব্যাহতভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

‘৬১ যেন ৬২ না হয়, খেয়াল রাখুন’

ত্রাণমন্ত্রী গতকাল বিকেলে সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সভায় উপস্থিত পাউবো প্রকৌশলীদের উদ্দেশে তিনি সুনামগঞ্জের হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসলডুবির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‌‘আপনারা সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করেন না। যে কারণে আপনাদের ৬১ জন কর্মকর্তার নামে মামলা হয়েছে। সবাই ভালো হয়ে যান। এই ৬১ যেন ৬২ কিংবা তার বেশি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। সরকার এসব কাজে জিরো টলারেন্স নিয়েছে।’

সুনামগঞ্জের ১৫৪টি হাওরে পাউবোর ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় গত রোববার দুদক পাউবোর ৫ প্রকৌশলীসহ ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে।

সিলেটে আরও অবনতি

গতকাল বিকেল থেকে টানা বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গতকাল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে জকিগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নারী ভাইস চেয়ারম্যান নাসরিন জাহান ফাতেমা জানান, উপজেলার পশ্চিম ইসলামপুর, পূর্ব ইসলামপুর, উত্তর রণিখাই, দক্ষিণ রণিখাই, তেলিখাল ও ইছাকলস ইউনিয়নের অন্তত ৪০টি গ্রাম গতকাল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো উপজেলায় পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা লাখের কাছাকাছি। তবে বন্যার্তদের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে।

বন্যার্ত লোকজন ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলায় বন্যাকবলিত গ্রামের সংখ্যা বেশি। গতকাল সকালের দিকে এসব উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কিন্তু বিকেলের পর থেকে বৃষ্টিপাত হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ১০ উপজেলায় প্রায় ২ লাখ মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। তবে জেলা প্রশাসনের মতে, এ সংখ্যা ৬০-৭০ হাজার।

গতকাল দুপুরে ফেঞ্চুগঞ্জে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মায়া এবং বিয়ানীবাজারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন।

মৌলভীবাজারে অপরিবর্তিত

মৌলভীবাজারে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে জেলার পাঁচটি উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী। কুশিয়ারা নদী, হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরে পানি বৃদ্ধির কারণে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার পানি কিছুটা কমলেও বন্যার ভয়াবহতা কমেনি। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটে পানি থাকায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

বড়লেখার ইউএনও এস এম আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, উপজেলায় আরও একটি আশ্রয়কেন্দ্র বেড়েছে। এ নিয়ে ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ২৬৯টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৩৩টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৩০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫১৯টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া ২৭৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যাকবলিত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ আছে। বন্যায় আউশ ও রোপা আমনের ৯৫৫ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম গতকাল বলেন, এটা সত্য হাওর এলাকায় মানুষের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, দু-তিন দিন আগে যে রাস্তাগুলো ডোবা ছিল, সেগুলোর কিছু কিছু ভেসে উঠছে।

বগুড়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ

পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে বগুড়ার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পাউবো ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ছয়টা থেকে গতকাল সকাল ছয়টা পর্যন্ত) এখানে ১৩ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধির তথ্য রেকর্ড করেছে।

বগুড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, নদী ফুঁসে উঠে প্রবল স্রোত বইছে। দ্রুত পানি ছড়িয়ে পড়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপারের নদী তীরবর্তী লোকালয়ের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ছে।

সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলায় যমুনার ডান তীরবর্তী এবং বাঁ তীরের চরাঞ্চলের বাড়িঘরে পানি উঠতে শুরু করায় লোকজন মালামাল, গরু-ছাগল নিয়ে পাশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছে।

যমুনায় পানি বাড়তে থাকায় সারিয়াকান্দি সদরের কালিতলা হার্ডপয়েন্টে (গ্রোয়েন) নৌঘাট ওপরের দিকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সোনাতলা উপজেলার খাটিয়ামারি চরের কয়েক শ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।