রবিবার , ডিসেম্বর ১৫ ২০১৯
শিরোনাম

ফেঞ্চুগঞ্জে বন্যা

আশপাশে থই থই পানি। ঘরদোর সবই ডুবে গেছে। পানির ভেতরে কাঠের চৌকি পেতে তার ওপর চুলা বসিয়ে রান্না করছিলেন বৃষ্টি আক্তার। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সদরের এ গৃহিণী জানালেন, এক মাস ধরে তাঁকে এভাবে রান্নাবান্না সারতে হচ্ছে।

ফেঞ্চুগঞ্জ সদরসহ আশপাশের পাঁচটি ইউনিয়নের অসংখ্য পরিবারের এখন পানিবন্দী জীবন কাটছে। কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের এ দুর্ভোগ। বন্যাকবলিত বিভিন্ন গ্রামে গতকাল রোববার দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সরেজমিনে মানুষজনের দুর্ভোগ-দুর্দশা চোখে পড়ে।

উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে, বন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জের ৫০টি গ্রামের অন্তত ৪৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। তবে স্থানীয় ব্যক্তিদের মতে,এ সংখ্যা আরও বেশি। এসব পরিবারের কারও উঠানে, কারও ঘরে পানি উঠে গেছে। প্রতিটি বাড়ি যেন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। বাড়িঘর ছাড়াও দোকানপাট, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানেই পানি উঠেছে।

কুশিয়ারা নদীর গা-ঘেঁষেই ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরের বাজার অবস্থিত। কুশিয়ারার পানি এখন বিপৎসীমার ১ দশমিক ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ফেঞ্চুগঞ্জ সদরের প্রায় সব বসতঘর ও দোকানপাট পানির নিচে তলিয়ে আছেডুবে গেছে বাজারের সব কটি রাস্তা। হাঁটু থেকে বুকসমান পানি ঠেলে রাস্তায় রিকশা ও যানবাহনের পাশাপাশি নৌকাও চলছে।

সদরের মূল সড়কে হাঁটুপানি ঠেলে হেঁটে যাচ্ছিলেন ভাই ভাই নার্সারির স্বত্বাধিকারী আহমেদ মনসুর। তিনি বললেন, রমজানের ৩ তারিখে কুশিয়ারার পানি উপচে রাস্তা ডুবে যায়। সপ্তাহখানেক পর সদরের অধিকাংশ দোকানপাট তলিয়ে যায়। তাঁর নার্সারির অন্তত ৮০০ চারা তলিয়ে গেছে।

ফেঞ্চুগঞ্জ আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ছয়জন শিক্ষককে গল্প করতে দেখা যায়। ঈদের ছুটির পর গত শনিবার প্রথম বিদ্যালয় খুলেছে। প্রধান শিক্ষক রুজি বেগম জানালেন, বিদ্যালয়ের আঙিনা ও শ্রেণিকক্ষে বন্যার পানি উঠে গেছে। দুদিনে ২০৭ শিক্ষার্থীর একজনও বিদ্যালয়ে আসেনি।

বিদ্যালয় থেকে আরেকটু সামনে এগোলেই ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার। মেঘনা সাজঘর অ্যান্ড কসমেটিকস দোকানে চার যুবক আড্ডা দিচ্ছিলেন। দোকানটির ভেতরেও পানি। দোকানের স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল কবির বললেন, দোকান খুলে বসে আছেন। কিন্তু কোনো ক্রেতা নেই। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ১৫-২০ হাজার টাকার জিনিস বিক্রি হতো।

ফেঞ্চুগঞ্জ বণিক সমিতির কার্যকরী কমিটির আহ্বায়ক আবদুল বারীর হিসাবে, সদরের প্রায় ৭০০টি দোকানের মধ্যে ৫০০টিই তলিয়ে গেছে। পাশের কুলাউড়া, বড়লেখা, বালাগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার কিছু মানুষও এখানে ঈদের কেনাকাটা সারতেন। অথচ এবার এখানে ঈদবাজার জমেইনি।

এলাকার একাধিক ব্যক্তি বললেন, কুশিয়ারা নদী নিয়মিত খনন করা হয় না। পাশাপাশি বাজারের রাস্তাটি প্রয়োজনমতো উঁচু নয়। এ দুই সমস্যার সমাধান হলেই তাঁরা বন্যা থেকে অনেকটা রেহাই পেতেন।

তবে এমন বক্তব্যকে অযৌক্তিক বলছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভারতের বরাক উপত্যকায় সম্প্রতি অব্যাহতভাবে বৃষ্টি হয়েছে। বরাকের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে মিশছে। তাই নদী উপচে বন্যা দেখা দিচ্ছে। বৃষ্টি না কমলে পরিস্থিতির উন্নতির খুব একটা সম্ভাবনা নেই।

ফেঞ্চুগঞ্জ সদরের পাশাপাশি ঘিলাছড়া, উত্তর ফেঞ্চুগঞ্জ, উত্তর কুশিয়ারা ও মাইজগাঁও ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামে গতকাল নৌকায় ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বাড়িঘর ও আঙিনায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। তলিয়ে গেছে জমির ফসল। মানুষের কাজকর্ম বন্ধ। পানি কমার আশায় অনেকে সেখানেই থাকছেন। অন্যরা ঘরবাড়ি ফেলে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হুরে জান্নাত প্রথম আলোকে বলেন, বন্যার্তদের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা করছে। উপজেলার ৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫২টি পরিবার উঠেছে।