রবিবার , ডিসেম্বর ১৫ ২০১৯
শিরোনাম

পাহাড়জুড়ে অবৈধ বসতি

অননুমোদিত জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি। ছবি: সংগৃহীত

পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ের পর পাহাড়জুড়ে যেসব বাড়িঘর ও জনবসতি গড়ে উঠেছে, এখন প্রশাসন বলছে সেগুলো সবই অননুমোদিত। অর্থাৎ অবৈধ।

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গত ১৩ জুনের পাহাড়ধসের ঘটনায় ১ হাজার ২৩১টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ এবং ৯ হাজার ৫৩৭টি আংশিক ধ্বংস হয়েছে। লোক মারা গেছে ১২০ জন। আহত হয়েছে ৮৮ জন। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো করা যায়নি। তবে তা যে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, তা নিশ্চিত।

পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সূত্রগুলো বলছে, পাহাড়ে পাহাড়ে যেখানে-সেখানে বাড়িঘর গড়ে তোলার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল না। এসব বাড়িঘরে যারা বসবাস করত বা করে, তারা কোথা থেকে, কীভাবে এখানে এসেছে তা-ও স্পষ্ট নয়। এমনকি তাদের মধ্যে বৈধ পুনর্বাসিত বাঙালির (সেটেলার) সংখ্যাও কম।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, সব বাড়িঘরই অননুমোদিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।

বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা প্রথম আলোকে বলেন, শুধু রাঙামাটিতে নয়, তিন পার্বত্য জেলায়ই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অব্যাহতভাবে লোক আসছে। এসে যেখানে-সেখানে ইচ্ছেমতো বসতি গড়ে তুলছে। এটি নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ কারোর নেই। বরং এভাবে লোক আসা এবং বসতি গড়ার পেছনে ইন্ধন আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে রাঙামাটি টিভি সেন্টার পাহাড়ের পাশে গড়ে ওঠা বাড়িঘর ভেঙে জনবসতি উচ্ছেদ করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তারপরও উচ্ছেদ করা যায়নি। বরং অননুমোদিত সেই সব বাড়িঘরে বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়। নলকূপ বসিয়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়।

বিষয়টি সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য আমরা কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। রাঙামাটি সরকারি কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে দেখা পাই মো. নুরুল ইসলামের। ১৩ জুনের পাহাড়ধসে বাড়িঘর হারিয়ে এই আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন তিনি। মাত্র দেড় বছর আগে রাঙামাটি টিভি সেন্টারের পাশের পাহাড়ে বাড়ি করেছেন। জায়গার নাম রূপনগর।
তাঁর আদি বাড়ি চাঁদপুরে। পিতা মো. আলাউদ্দিনের সঙ্গে বছর বিশেক আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছেন বলে দাবি করে তিনি বলেন, প্রথমে কিছুদিন এখানে-সেখানে বসবাস করার পর তাঁরা চলে যান খাগড়াছড়ি। প্রায় ১৫ বছর সেখানে ছিলেন। সেখান থেকে দেড় বছর আগে এসে পাঁচ শতক জায়গা কিনে রূপনগরে বাড়ি করেন। পাহাড়ধসে বাড়িটি সম্পূর্ণ ধসে গেছে। স্ত্রী-কন্যাসহ তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন বলে বেঁচে আছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে নূরুল ইসলাম বলেন, একজন আনসার সদস্য ওই জায়গা দখলে নিয়ে বাগান করেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে তিনি ২৫ হাজার টাকায় পাঁচ শতক জমির ‘দখলিস্বত্ব’ কিনে বাড়ি করেন।

ওই আশ্রয়কেন্দ্রেই দেখা হয় রিজিয়া বেগমের সঙ্গে। তাঁর স্বামী জয়নাল সরদার খুলনার লোক। ১২ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে রাঙামাটিতে এসে রূপনগরেই ভাড়া বাসায় থাকতেন বলে জানান রিজিয়া। মাত্র চার মাস আগে জনৈক তাহেরের কাছ থেকে চার শতক জমি কেনেন দেড় লাখ টাকায়। ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকি ৭০ হাজারের জন্য তাহের তাড়া দিচ্ছেন। আর কয়েক দিনের মধ্যে টাকা দিতে না পারলে জমি বেহাত হবে বলে হুমকি দিচ্ছেন তাহের।

রাঙামাটি টিভি সেন্টার আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন মো. জাহাঙ্গীর। বরগুনার বামনা থেকে রাঙামাটিতে এসে কয়েক বছর তবলছড়ি এলাকায় থাকতেন। ছয় বছর আগে সাত শতক জমি কিনে বাড়ি করেন শিমূলতলীতে। সেই বাড়ি চাপা পড়েছে ধসে পড়া পাহাড়ের নিচে।

ওই শিমূলতলীতেই পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে মারা গেছেন দুই ভায়রা মো. আলম ও আব্বাস মোল্লা। তাঁদের দুজনের স্ত্রী দুই বোন যথাক্রমে পারভিন বেগম ও নূরজাহান বেগম। তাঁরাও আছেন টিভি সেন্টার আশ্রয়কেন্দ্রে। তাঁরা বলেন, তাঁরা এবং তাঁদের মৃত স্বামীরা বাগেরহাটের লোক। ১৯৯৭ সালে রাঙামাটিতে এসে ১ নম্বর ফরেস্ট কলোনিতে ভাড়া থাকতেন। ২০০৩ সালে শিমূলতলীতে জায়গা কিনে বাড়ি করেন। তাঁদের সেই বাড়ি পাহাড়ধসে বিধ্বস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া বিএডিসি ভবন আশ্রয়কেন্দ্রে কথা হয় চাঁদপুরের মিজান, শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ির নূরজাহান ও নরসিংদীর নূরহাজান বেগমের সঙ্গে। তাঁরা পশ্চিম মুসলিমপাড়া পাহাড়ে জমি কিনে বাড়ি করেছেন ১০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত সহকারী কমিশনার, পাহাড়ধসের পর স্থাপিত নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খোন্দকার ইখতিয়ার উদ্দিন আরাফাত বলেন, জেলা প্রশাসন চেষ্টা করছে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে অননুমোদিত বসতি সরিয়ে দেওয়ার। ইতিমধ্যে এ রকম তিনটি বাড়ি চিহ্নিত করে তারা ভেঙে দিয়েছে। এ রকম পাওয়া গেলে আরও ভেঙে দেওয়া হবে।