বৃহস্পতিবার , অক্টোবর ১৭ ২০১৯
শিরোনাম

টানা বৃষ্টিতে বন্যা বাড়বে

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে যমুনা নদীর পানি বেড়েই চলেছে। গতকাল বুধবার বগুড়ার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধির কারণে যমুনাসংলগ্ন নদীপারের মানুষ অসহায় বোধ করছে। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। ছবিটি বৃহস্পতিবার দুপুরে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার রৌহদহ গ্রাম থেকে তোলা।

কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টি ঝরছে সারা দেশে। কখনো থেমে থেমে, কখনো বা ঝুমবৃষ্টি। এভাবে বৃষ্টি হতে থাকলে দেশের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জুন মাসে বাংলাদেশে বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল ৩৪৭ মিলিমিটার। কিন্তু বৃষ্টি হয়েছে ৪৫৭ মিলিমিটার। অর্থাৎ পূর্বাভাসের চেয়ে গড়ে ১১০ মিলিমিটার বেশি বৃষ্টি হয়েছে। গত ৩০ বছরের বৃষ্টিপাতের গড় হিসাব করে স্বাভাবিক বৃষ্টির পূর্বাভাস নির্ধারণ করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জুনে সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে শতকরা ৩ দশমিক ৭ ভাগ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
জুনের পর চলছে জুলাই মাস। কিন্তু বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসেবে আষাঢ় মাস বিদায় নিতে আরও কয়েক দিন বাকি আছে। আষাঢ়ের বিদায়লগ্নে বৃষ্টির মাত্রা আরও বাড়তে পারে। আর বৃষ্টির মাত্রা বাড়লে দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সময় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল নদীভাঙন ও নদীতীরবর্তী এলাকা ডুবে যেতে পারে।
২ জুলাই অনুষ্ঠিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু ও পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে সিলেটে—৯৫০ মিলিমিটার, যা এই বিভাগীয় অঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টির চেয়ে শতকরা ৪৯ দশমিক ৮ ভাগ বেশি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২১ দশমিক ৩, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৭ দশমিক ৪ ও ঢাকা বিভাগে ২ ভাগ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। তবে জুন মাসে দাবদাহের কারণে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে।
দেশজুড়ে মৌসুমি বায়ুর বিস্তার ঘটায় জুলাই মাসে বৃষ্টি পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে। ১ জুলাই থেকে ৬ জুলাই সকাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাতেই ১৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয় হওয়ায় বৃষ্টির মাত্রা ঢাকাতেই নয়, সারা দেশেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, জুলাইয়ে ৪৬৫ মিলিমিটার থেকে ৫৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। তাহলে জুনের চেয়ে জুলাই মাসে ১০০ মিলিমিটার বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর থেকে আসা বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প রয়েছে। এই বাতাস ঊর্ধ্বমুখী হয়ে প্রচুর মেঘ সৃষ্টি করছে। এ কারণে দেশে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ৬ ও ৭ জুলাই বৃষ্টির এই ধারা কিছু কমতে পারে। তবে, ৮ জুলাইয়ের পর বৃষ্টি বেশি হতে পারে।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাব প্রতিবেশী ভারতেও পড়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশটির উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতেও প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে।
ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ওয়েদার ফোরকাস্টিং সেন্টার পূর্বাভাস থেকে জানা গেছে, ৬ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত আসাম, মেঘালয়, উত্তরাখন্ড, উত্তর প্রদেশর পূর্বাঞ্চল, ছত্তিশগড়, বিহার, পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, সিকিম, ওডিশা, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব রাজ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বৃষ্টি হোক আর না-ই হোক, এখানকার নদ-নদী ফুলেফেঁপে উঠবে। কারণ, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদী। এ কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক আমানত উল্লাহ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গঙ্গা নদী উত্তরাখন্ড হয়ে বাংলাদেশে ঢোকে পদ্মা নামে। আসাম হয়ে এসেছে ব্রহ্মপুত্র। তিস্তা এসেছে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে। তাই ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য ভারী বৃষ্টি হলে আমরা বন্যার বিপদের মধ্যে আছি। দুই দেশের আবহাওয়া একই ধরনের। এটি আলাদা করা যায় না। আমাদের দেশে বৃষ্টি না হলেও ভারতের এসব রাজ্যে বৃষ্টির প্রভাব তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে পড়বে।’
দেশের ৩২টি নদ-নদী পর্যবেক্ষণ করে থাকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলে সুরমা, কুশিয়ারা ও কংস নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে ছিল।
বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভয়ংকর হয়ে উঠছে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা। বৃহস্পতিবার বিকেলে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা পানি উদ্বেগজনক মাত্রায় চলে এসেছে। এ তথ্য জানিয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, চীন থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসাম হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। অরুণাচল প্রদেশ বৃষ্টি হলে ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়বে। যে ধারায় পানি পাচ্ছে, তাতে শুক্রবারেই ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।