রবিবার , ডিসেম্বর ১৫ ২০১৯
শিরোনাম

উল্টো পথে গাড়ি আর কত?

খাইরুন বিবির জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কেবলই ওমান থেকে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে স্বজনদের সঙ্গে মাইক্রোবাসে করে ফিরছিলেন নিজের গ্রাম সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পরাণপুরে। পথে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কাজীর রাস্তা এলাকায় বেনাপোল থেকে শ্যামলী পরিবহনের ঢাকাগামী একটি বাস খাইরুন বিবিকে বহনকারী মাইক্রোবাসকে সামনে থেকে ধাক্কা দেয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই খাইরুন বিবি নিহত হন। দুর্ঘটনায় খাইরুনের বাবাসহ আরও পাঁচজন মারা যান। আহত হন তাঁর দুই ছেলে।

প্রথম আলোর ফরিদপুর অফিস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় দুই বছর আগে ২০১৫ সালে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে খাইরুন বিবি ওমানে যান। সেখানে তিনি একটি বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু সেখানে তাঁর ওপর প্রায়ই নানা ধরনের নির্যাতন চলত। বেতনও ছিল খুব কম। মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকা পেতেন। তাও ঠিকমতো দেওয়া হতো না। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে খাইরুন চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। গতকাল শুক্রবার সকালে তিনি দেশে ফেরেন। আর রাতেই তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

খাইরুন বিবির জন্য খারাপ লাগছে তাঁর দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে। একটু সুখের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন খাইরুন। নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন, সংসারে আর কোনো অভাব-অনটন থাকবে না। মনে কত স্বপ্ন আর আশাই না ছিল। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হলো না। সুখ থেকে গেল অধরা। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে যাও-বা দেশে ফিরলেন, তাও আর বাঁচতে পারলেন না। এ রকম দুর্ভাগা আর কে আছে? মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল শুধু একজন বাসচালকের ভুলের কারণে।

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, শ্যামলী পরিবহনের যে বাসটি খাইরুনকে বহনকারী মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়, তা ভুল পথে আসছিল। কেন চালকেরা উল্টো পথে গাড়ি চালান? উল্টো পথে গাড়ি চালানোতে বা চালকের ভুলের কারণে কত মানুষের যে প্রাণ গেছে আর কত মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

২০১৪ সালের ২০ অক্টোবরের ঘটনা। নাটোর বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে ২০ অক্টোবর যাত্রীবাহী একটি বাস একটি ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে অপর একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ৩৩ জন নিহত হন। গত বছরের মার্চ মাসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আবর্জনাবাহী গাড়ি উল্টো পথে গিয়ে চাপা দেয় আবুল কালাম আজাদ (৪৫) নামের এক লিফট ব্যবসায়ীকে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিনি। গত ৮ মার্চ রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে উল্টো পথে আসা মাইক্রোবাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন পরিবহন শ্রমিক।

ট্রাফিক আইনে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর শাস্তি ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা। শাস্তি এত লঘু হলে উল্টো পথে গাড়ি চালাবে না কেন?

চালকেরা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ হত্যা করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, আইনে এ অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড।

এসব আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আইন আরও কঠোর করতে হবে। কঠোর আইন না থাকায় সড়কপথে যাত্রীদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। অদক্ষ চালক, ফিটনেসহীন গাড়ি, যথাযথ ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকা এবং আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবহন মালিক ও চালকের কাছে যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়ছে। এই দুর্গতি ও অব্যবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে অতি শিগগির উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে আমাদের আরও অনেক খাইরুন বিবির মৃত্যু দেখতে হবে।