বৃহস্পতিবার , অক্টোবর ১৭ ২০১৯
শিরোনাম

বিধ্বস্ত বাড়ি গড়ে দিচ্ছেন তিনি

আবু সালেমের দলে ১২ জন নির্মাণকর্মী রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত দিরা শহরে ভবন পুনর্নির্মাণের কাজ করেন তাঁরা। ছবি রয়টার্সের।

তাঁদের কাছে আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই। ভবন মেরামতের জন্য দরকারি নির্মাণসামগ্রীও অপ্রতুল। যুদ্ধের কারণে বেড়ে গেছে রড-সিমেন্টের দাম। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা দমাতে পারেনি আবু সালেম ও তাঁর দলের লোকদের। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামত করে যাচ্ছেন তাঁরা। যাতে কম সময়ের জন্য হলেও এতে আশ্রয় নিতে পারে সাধারণ মানুষ।

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে মর্টার শেলে ক্ষতবিক্ষত একটি বাড়ি মেরামতের কাজ করছিলেন আবু সালেম। কয়েকজন কংক্রিট মেশানোর কাজ করছিলেন। আর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছিলেন আবু। তিনি বলেন, ‘মেরামত করা হলেও কিছুদিন পর আবার গুলি-বোমায় নষ্ট হতে পারে বাড়িটি। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত যদি কেউ বাড়িটিতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও থাকতে পারে—সে আশায় কাজ চলছে।’

আবু সালেমের দলটিতে মোট ১২ জন নির্মাণকর্মী রয়েছেন। ব্যারেল বোমা, বিমান হামলা বা মর্টার শেলে ক্ষতিগ্রস্ত সিরিয়ার দিরা শহরে ভবন পুনর্নির্মাণের কাজ করেন তাঁরা। নির্মাণসামগ্রীর অপ্রতুলতা ও দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অন্যান্য ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের কংক্রিট দিয়েই কাজ চালানো হয়। কংক্রিট মেশানো থেকে শুরু করে ভার বহন—সব কাজ নিজেদেরই করতে হয় তাঁদের।

তিন মাস আগে সিরিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও চিত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা গিয়েছিল, মুখোশ পরা কয়েকজন মানুষ চিৎকার করে বলছে, ‘আল্লাহ মহান’। স্বাভাবিকভাবেই দেশটির বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রথম দর্শনে মনে হচ্ছিল, এটি হয়তো কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রোপাগান্ডা।

আদতে এটি ছিল আবু সালেমের কাজ শুরু করার ঘোষণা। ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর নামে আমি আবু সালেম আল-মুহামিদ ঘোষণা করছি যে স্বাধীন এলাকাগুলোয় কংক্রিট ঢালাইয়ের ব্রিগেড গঠন করা হয়েছে। যদি তোমরা ধ্বংস কর, আল্লাহর দোহাই আমরা আবার পুনর্নির্মাণ করব।’

রয়টার্সের খবরে জানানো হয়, এরপর থেকেই আবু সালেমের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। আবু বলেন, ‘অনেকে বলেছে, সিরীয় সংকট শুরুর পর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিগেডটি তৈরি করেছি আমি।’

যুদ্ধ সিরিয়ার জাতীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সংঘাতের কারণে দেশটির বাণিজ্য পথগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। অবশ্য ঘুষ দিয়ে ও কর দিয়ে কিছু পণ্য আসে দেশটিতে। ফলে বিভিন্ন পণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে।

৩৯ বছর বয়সী আবু সালেম বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে থাকেন। ভবন মেরামতের জন্য নির্মাণসামগ্রী সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আনেন। দামেস্ক থেকে এক টন সিমেন্ট কিনতে গেলে দাম পড়ে প্রায় ৩০ হাজার সিরীয় পাউন্ড। দিরা শহরে নিয়ে আসতে আসতে এর দাম দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার পাউন্ড। কারণ, পথে অনেকগুলো চেক পয়েন্টে ঘুষ ও কর দিতে হয়।

আবু সালেম বলেন, ‘যখন ওই সিমেন্ট আমাদের হাতে আসে, তখন এর দাম ৫০, ৬০ বা ১০০ শতাংশ বেড়ে যায়।’

পাঁচ সন্তানের জনক আবু সালেম যুদ্ধ শুরুর আগেও নির্মাতা হিসেবেই কাজ করতেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কাজ চালাতে গিয়ে নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। এখন চাইলেও কোনো প্রকৌশলীকে তিনি খুঁজে পান না। বাড়ি সারাইয়ের কাজ করতে গিয়ে মেলে না সিমেন্ট বা কংক্রিট মেশানোর যন্ত্রপাতি। তাই আবু সালেম ও তাঁর ব্রিগেডের লোকেরা নিজেরাই সব কাজ করেন। এতে মেরামত করা ভবনের মান কমে যাচ্ছে বলেও স্বীকার করেন আবু সালেম।

মক্কেলের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রিগেডের সদস্যদের বেতন দেওয়া হয়। প্রতিদিনের কাজের জন্য তাঁরা গড়ে পান সাকল্যে চার থেকে পাঁচ ডলার। আবু সালেম বলেন, ‘এই অর্থ দিয়ে শুধু খাবার আর পানির খরচ মেটানো যায়। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের কোনো সঞ্চয় নেই।’

সবাই রাজি থাকলে পুরো সিরিয়াকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন আবু সালেম। তিনি বলেন, ‘কিন্তু কেউ যদি একটি রকেট বা অস্ত্র হাতে দিয়ে যুদ্ধ করতে বলে, তবে আমি তা পারব না।’